বাঁশবনের ধারে থাকে আনানসি মাকড়সা — আর তার ছোট্ট ছানা টুকু। একদিন আনানসির চোখ চকচক করে উঠল। “শোন টুকু, দুনিয়ার সব বুদ্ধি আমি জমাব — সব, স-অ-ব আমার একার!” খুশিতে তার আট পা নেচে উঠল থপথপ।
পরদিন থেকে আনানসি বেরোল মাটির হাঁড়ি নিয়ে। এখান থেকে একটু বুদ্ধি, ওখান থেকে একটু, ঝোপের নিচ থেকে আরেকটু — টুপটাপ, টুপটাপ, হাঁড়িতে পড়ে। হাঁড়ি যত ভরে, আনানসির বুক তত ফুলে ওঠে। বলো তো, এত বুদ্ধি একা নিলে বাকি সবার কী থাকে?
হাঁড়ি এখন ভরা, ভারী, ভেতরে বুদ্ধি ঝিকমিক করে। আনানসি ফিসফিস করে বলল, “টুকু, কাউকে বলবি না! ওই যে সবচেয়ে উঁচু বটগাছ — ওর মাথায় লুকিয়ে রাখব, কেউ পাবে না, কেউ না!” বলে সে হাঁড়িটা শক্ত করে বাঁধল নিজের পেটের সামনে।
এক পা, দুই পা, তিন পা — খটখট! হাঁড়িটা গুঁড়িতে ঠোকা খায়, আর আনানসি পিছলে নামে ঝুরঝুর। আবার ওঠে, আবার পিছলায়, আবার! আট পা টানটান, দম প্রায় বন্ধ। নিচ থেকে টুকু ডাকল, “বাবা, হচ্ছে না কেন?” “হবে, হবেই হবে!” হাঁপাতে হাঁপাতে বলল আনানসি।
টুকু মাথা কাত করে খানিক দেখল। তারপর সহজ গলায় বলল, “বাবা, হাঁড়িটা পিঠে বাঁধো না — তাহলেই তো উঠতে পারবে।” আনানসির আট পা একসাথে থমকে গেল। হাঁড়িভরা এত বুদ্ধি তার — অথচ এইটুকু কথা জানত শুধু তার ছোট্ট টুকু।
সেই থমকানোতেই বাঁধন গেল আলগা হয়ে। হুড়মুড়! মাটির হাঁড়ি ভেঙে চুরমার, আর বুদ্ধিগুলো ঝিকমিক করে উড়ল বাতাসে। হরিণ পেল একটু, পাখি পেল একটু, ছোট্ট পিঁপড়েও পেল একটুখানি। আনানসি যা জমিয়েছিল এত দিনে, তা আর ফিরল না কোনো দিনই।
সন্ধ্যায় বটগাছের ঝুরির ফাঁকে জোনাকি জ্বলল টিমটিম। আনানসি ভাঙা হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল — বুকটা একটু খালি খালি, তবু হাসি। “টুকু রে, সব বুদ্ধি আমার হাঁড়িতে ছিল না — একটুখানি ছিল তোর কাছেও।” বলে ছানাকে তুলে নিল পিঠে।