শীতের ভোর। বিলজুড়ে কুয়াশা, খেজুরগাছে রসের হাঁড়ি। আর বিলের ধারে? কথা, কথা, কথা! কচ্ছপের মুখ চলে খলবল-খলবল — মাছেরা ডুব দেয়, ব্যাঙ কানে পাতা গোঁজে। শুধু দূর দেশ থেকে আসা দুই অতিথি হাঁস হেসে বলে — “তারপর? তারপর কী হলো, ভাই?”
শীত ফুরোলো। হাঁসেরা বলল — “ভাই, এবার আমাদের পাহাড়ের দেশে ফিরতে হবে। সেখানে দিঘির পানি কাচের মতো!” কচ্ছপের বুক ধক করে উঠল — “আর আমি? আমি তো উড়তে জানি না…” দুই হাঁস চুপ। তারপর দুজনের চোখ একসাথে ঝিকিয়ে উঠল — বুদ্ধি!
হাঁসেরা আনল শক্ত এক লাঠি। — “আমরা দুই মাথা ধরব ঠোঁটে, তুমি কামড়ে ধরবে মাঝখানটা। কিন্তু মনে রেখো ভাই — আকাশে মুখ খুলবে না। একটি কথাও না!” — “আমি? চুপ থাকা তো পানির মতো সোজা!” — বলেই কচ্ছপ কট্ করে কামড়ে ধরল লাঠি।
হুস-হাস, হুস-হাস — ডানার তালে আকাশে উড়াল! নিচে সরষেখেতের হলুদ, নদীর রুপালি ফিতে, পুতুলের মতো ছোট্ট গ্রাম — দেখেছ কখনো এত ওপর থেকে? কচ্ছপের পেটে কথারা ফুড়ফুড় করে। “কী সুন্দর!” বলতে গিয়েও ঢোঁক গিলে ফেলে। মনে মনে আওড়ায় — একটি কথাও না… একটি কথাও না…
গ্রামের ওপর দিয়ে উড়ছে ওরা। ঘুড়ি-ওড়ানো ছেলেমেয়েরা নিচ থেকে চেঁচাল — “ও দেখ, দেখ! দুই হাঁস লাঠিতে কচ্ছপ ঝুলিয়ে নিয়ে যায়! হি-হি-হি! বোকা কচ্ছপ!” বোকা?! কচ্ছপের কান গরম, বুক ফেটে যায়! — “বোকা নই! আমি নিজেই—” মুখ খুলল। লাঠি ছুটল। আ-আ-আ!
ধপাস! নরম কাদায়, পুকুরপাড়ে। প্রাণে বাঁচল, কিন্তু — মট্! পিঠের খোলসে ফুটে উঠল ফাটা-ফাটা দাগ, মাটির হাঁড়ি ফাটার মতো। হাঁসেরা ছুটে এল — “ভাই! ব্যথা পেলে?” কচ্ছপ মুখ খুলল… তারপর আস্তে বুজে ফেলল। এই প্রথম — কচ্ছপের মুখে কথা নেই।
কচ্ছপ রয়ে গেল সেই পুকুরেই। আবার শীত এল — অতিথি হাঁসেরা ফিরে এল! জ্যোৎস্নায় চিকচিক করে পিঠের ফাটা দাগ। হাঁস আস্তে বলল — “ব্যথা করে, ভাই?” কচ্ছপ হাসল — “থাক না দাগ। মনে করিয়ে দেয় — কথা জানা বড় গুণ, চুপ থাকতে জানা আরও বড়।”