শরতের সকাল। নদীর বুকে জেগে আছে ধু-ধু বালুচর — কাশফুলে সাদা। ভাটার টানে পানি নেমেছে, আর ভেজা বালিতে রোদ পোহাতে খুলে বসেছে ঝিনুক। তার বুকের ভেতর ঝিকমিক করছে একটামাত্র মুক্তা — সবচেয়ে আদরের ধন। দূরে এক পা এক পা করে খাবার খোঁজে ক্ষুধার্ত বক।
বকের চোখ পড়ল খোলা ঝিনুকের নরম বুকে। আহ্, কী নরম খাবার! ফড়ফড় উড়ে এসে — ঠক্! মারল ঠোকর। আর অমনি — খটাস্! ঝিনুক বন্ধ! বকের লম্বা ঠোঁট আটকা পড়ল পাথরের মতো শক্ত খোলসে। — “ছাড়!” — “ছাড়ব না!”
বক টানে, ঝিনুক কামড়ে থাকে। বক চোখ পাকিয়ে বলল — “আজ বৃষ্টি নেই, কাল বৃষ্টি নেই — শুকিয়ে কাঠ হবি রে ঝিনুক!” ঝিনুক চাপা গলায় বলল — “আজ ছাড়ব না, কাল ছাড়ব না — উপোসেই কাটবে রে বক!” কেউ হারে না, কেউ ছাড়ে না।
রোদ গড়িয়ে গেল পশ্চিমে। তবু টানাটানি চলছেই — বক টানে তো টানে, ঝিনুক কামড়ে তো কামড়েই। এত জেদের মাঝে কেউ দেখলই না — চরের ওপারে জাল কাঁধে এগিয়ে আসছে এক জেলে। তোমরা কি দেখতে পাচ্ছ?
জেলে তো অবাক! ঝুঁকে দেখে — বক আর ঝিনুক, দুজন দুজনকে ধরে বসে আছে! হো-হো হেসে সে বলল — “দুই জেদি এক দামে! আজ আমার ভাগ্যটাই ভালো!” খপ্ করে দুজনকেই তুলে ফেলল ঝুড়িতে। ঢাকনা পড়ল — ঠক্।
অন্ধকার ঝুড়ি। বেতের ফাঁক দিয়ে আসে এক ফালি চাঁদের আলো। দুজন চুপ। অনেকক্ষণ পর ঝিনুক আস্তে বলল — “তোমার ঠোঁটে… ব্যথা?” খুট — সে ছেড়ে দিল। বক মাথা নিচু করে বলল — “আগে আমি ঠোকর দিয়েছিলাম। মাফ করো, বোন।”
ভোররাতে ঘাটে ঝুড়ি নামল। এবার দুজন এক হলো — ঝিনুক শক্ত খোলস ঠেলে দিল বেতের ফাঁকে, বকের লম্বা ঠোঁট চাড় দিল ঢাকনায়। ক্যাঁচ — ফাঁক! বক ঝিনুককে পায়ে তুলে উড়াল দিল — ঝপ! নদীতে! শুধু… মুক্তাটা রয়ে গেল ঝুড়ির তলায়।
ভোরের আলোয় সেই চর। পাশাপাশি বসে দুই বন্ধু — রোদ পোহায়, ঢেউ গোনে। শুধু ঝিনুকের বুক খালি — জেলের ঘরে সে-মুক্তা আর ফেরেনি। ঝিনুকের দীর্ঘশ্বাসে বক আলতো বলল — “মনে রাখিস, বোন — ঝগড়ায় দুজনেই হারে, লাভ কুড়ায় অন্যজন।”