বুড়ো গাধা ভোলা আর বস্তা টানতে পারে না। মালিক গজগজ করল — “অকেজো গাধা, দূর হ!” ভোলার কান দুটো ঝুলে পড়ল, মাথা নামল মাটির দিকে — তারপর হঠাৎ কান খাড়া! “আমি ব্রেমেন শহরে যাব, বাজিয়ে হব — আমার গলাই আমার গান! চিঁ-হোঁ, চিঁ-হোঁ!”
মেঠো পথে জিভ বের করে হাঁপাচ্ছিল এক বুড়ো কুকুর, লেজটা ধুলোয় লুটোনো। — “আর শিকার ধরতে পারি না ভাই, মালিক আমায় তাড়িয়ে দেবে,” মাথা নামিয়ে বলল লালু। ভোলা হেসে বলল — “তাড়াক গে! চলো ব্রেমেন — আমি গাইব, তুমি বাজাবে — ঘেউ ঘেউ!”
বটতলায় মনমরা বিড়াল মিনি — গোঁফ ঝুলে গেছে, ইঁদুর আর ধরতে পারে না; আর বেড়ার ওপর থরথর কাঁপছে মোরগ রঙিলা — কাল দাওয়াতে নাকি তাকেই রাঁধা হবে! ভোলা ডাকল — “চলো ব্রেমেন, সবাই মিলে বাজিয়ের দল!” চার বন্ধুর চার গলা — চিঁ-হোঁ! ঘেউ ঘেউ! মিঁয়াও! কক্কড়াকোঁ! বলো তো, চারটা গলা একসাথে ডাকলে কেমন শোনায়?
রাত নামল, ব্রেমেন আর এলো না। ঘন বনের ভেতর পথ হারিয়ে চারজন চুপ — পেট খালি, গা ঠান্ডা; শুধু ঝিঁঝিঁ ডাকে — ঝিঁ… ঝিঁ… ঝিঁ…। বুড়ো বটগাছের নিচে ওরা গায়ে গা লাগিয়ে বসল, আর রঙিলা ফড়ফড় করে উড়ে বসল উঁচু ডালে, আঁধারে চোখ মেলে।
হঠাৎ ডালের ওপর থেকে রঙিলা ডেকে উঠল — “কক্কড়াকোঁ! আলো! ঐ যে আলো!” বাঁশঝাড়ের ফাঁকে ছোট্ট এক টিনের চালা ঘর, জানালাটা জ্বলছে সোনার মতো। উঁকি দিয়ে দেখে — টেবিলে গরম ভাত, মাছ ভাজা, ভাপা পিঠা, মুড়ি-গুড়… আর ঘিরে বসে আছে দস্যুর দল! মিনির গোঁফ টানটান হয়ে গেল — “খাবার আজ ওদের না, আমাদের।”
পা টিপে টিপে ওরা জানালার নিচে এলো। ভোলার পিঠে উঠল লালু, লালুর পিঠে মিনি, আর সব্বার ওপরে ফুড়ুৎ করে রঙিলা — একটা আস্ত জন্তুর মিনার! ভোলা ফিসফিস করে বলল — “সবাই একসাথে — এক, দুই, তিন — বাজাও!”
চিঁ-হোঁ-ও-ও! ঘেউ ঘেউ ঘেউ! মিঁয়া-আ-ও! কক্কড়াকোঁ-ও-ও! — চার গলা একসাথে ফেটে পড়ল, আর ঝনঝন করে কেঁপে উঠল জানালা। দস্যুরা দেখল জানালাজুড়ে আকাশছোঁয়া এক দৈত্যের ছায়া! “ওরে বাবারে, ভূ-ভূ-ভূত!” — ভাত ফেলে, পিঠা ফেলে, দুদ্দাড় করে ওরা ছুটল বনের আঁধারে।
সেই রাতে চার বন্ধু পেট ভরে খেল — গরম ভাত, পিঠা, কুড়মুড়ে মুড়ি-গুড়, সব সাবাড়! তারপর কুপির নরম আলোয় কাঁথার ওপর গায়ে গা লাগিয়ে শুয়ে পড়ল — কান খাড়া, পেট গোল। ভোলা ঘুমঘুম গলায় বলল — “কে বলে আমরা অকেজো? আমরা ব্রেমেনের বাজিয়ের দল!” আর দস্যুরা? ভয়ে ওরা ঐ ঘরের ছায়াও আর কোনোদিন মাড়ায়নি।