রোদ ঝলমলে সকাল। উঠানে কুটকুট করে দানা খুঁটতে খুঁটতে লাল মুরগি পেল এক মুঠো সোনালি ধান। সে ডেকে বলল — “কে আমার সঙ্গে ধান বুনবে?” — “আমি না,” হাই তুলে বলল কুকুর। — “আমি না,” রোদে গা এলিয়ে বলল বিড়াল। — “আমি না,” গলা বাঁকিয়ে বলল রাজহাঁস। — “বেশ, তবে আমি নিজেই বুনব,” বলল মুরগি।
এল আষাঢ়। টাপুর-টুপুর বৃষ্টিতে ভিজে মুরগি ধান বুনে চলল — এক পা… আরেক পা… পেছনে ছানারা নরম মাটি চেপে দেয়। চালার নিচ থেকে কুকুর হাঁক দিল — “এই বৃষ্টিতে কেউ কাজ করে, বুবু?” মুরগি মুখ না তুলেই বলল — “ফসল কি আর নিজে নিজে হয়, ভাই?”
দিন যায়, মাস যায়। অগ্রহায়ণে মাঠ ভরল সোনালি ধানে — বাতাসে ঢেউ খেলে ঝিলমিল। মুরগি ডাকল — “কে আমার সঙ্গে ধান কাটবে?” — “আমি না,” বলল কুকুর। — “আমি না,” বলল বিড়াল। — “আমি না,” বলল রাজহাঁস। — “তবে আমি নিজেই কাটব।” কাস্তে চলল কচ্ কচ্ — সন্ধ্যা নামতে নামতে উঠানে জমল ধানের ছোট্ট পাহাড়।
— “কে আমার সঙ্গে ধান ভানবে?” — “আমি না! আমি না! আমি না!” — এবার তিনজন একসঙ্গেই বলে ফেলল। মুরগি ঢেঁকিতে পা রাখল — ধুপ! ধাপ! ধুপ! ধাপ! ছানারা কুলায় ঝেড়ে তোলে ধবধবে চাল। শোনো তো — উঠানজুড়ে কেমন তালে তালে বাজছে? ধুপ! ধাপ! ধুপ! ধাপ!
পৌষের হিম রাত। ঘরে মিটিমিটি জ্বলে হারিকেন। ছানারা ঘুমিয়ে কাদা। মুরগির ডানা দুটো টনটন করে, চোখের পাতা ভারী — তবু সে খেজুর গুড় আর চালের গুঁড়া মাখে, ভাপে বসায় একটা… দুটো… পিঠা। ঘুমন্ত ছানাদের দিকে তাকিয়ে তার ক্লান্তি যেন একটু হালকা হয়ে আসে।
ভোর হতেই উঠান ভরে গেল ভাপা পিঠার গন্ধে — ভুরভুর! দুদ্দাড় ছুটে এল তিনজন — “আমি খাব! আমি খাব!” মুরগি শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল — “ধান বুনল কে? কাটল কে? ভানল কে? পিঠা গড়ল কে?” তিনটি মাথা নেমে গেল — “তুমি… সবই তুমি।” — “তবে খাবও আমি — আর আমার ছানারা।”
গরম-গরম পিঠা খেল মুরগি আর ছানারা — আহ্, কী মিষ্টি! বেড়ার ওপারে তিনজন চুপ — সেদিন গন্ধটুকুই ছিল তাদের ভাগ। পিঠা মুখে ছোট্ট এক ছানা শুধাল — “মা, ওরা খেল না কেন?” মুরগি হেসে বলল — “কাজে যে হাত লাগায় না, ফলে সে ভাগ পায় না।” পরের আষাঢ়ে অবশ্য ডাকতে হয়নি — তিনজনই ছুটে এসেছিল।