অনেক অনেক দূরে, এক পাহাড়ি দেশে ছিল খরস্রোতা এক নদী। সেই নদীতে থাকত এক ঝাঁক কার্প মাছ — সবার ছোটটি ছিল সোনালি রঙের। একদিন বুড়ো কার্প বলল — “নদীর মাথায় আছে ড্রাগন-দুয়ার। যে মাছ সেই ঝরনা টপকাতে পারে, সে হয়ে যায় ড্রাগন!” ছোট্ট কার্পের বুকের ভেতর ঢিপঢিপ — “চলো না, দেখেই আসি!”
সাত দিন সাঁতরে ওরা পৌঁছাল নদীর মাথায়। ওমা! এ কী বিশাল ঝরনা! আকাশ থেকে যেন সাদা পানির পাহাড় ভেঙে পড়ছে — গুড়ুম-গুড়ুম শব্দে কানে তালা লাগে, কুয়াশার মতো পানির গুঁড়ো ওড়ে। বুড়ো কার্প ফিসফিস করে বলল — “ওই উপরে দুয়ার। কেউ কোনোদিন পার হতে পারেনি।”
শুরু হলো লাফ! ঝপাৎ! ঝপাৎ! একজন উঠল, পড়ল। আরেকজন উঠল, পড়ল। বেলা শেষে সবাই হাঁপাচ্ছে — “এ অসম্ভব! চল ভাই, ঘরে ফিরে যাই।” ছোট্ট কার্প পানির উপর মাথা তুলে বলল — “তোমরা যাও। আমি আর একবার লাফ দেব।”
বন্ধুরা ভাটির স্রোতে ভেসে চলে গেল। কার্প রয়ে গেল একা। সে লাফাল — দশবার… বিশবার… একশোবার! আঁশ ছড়ে গেল, পাখনা ব্যথায় টনটন করে। বলো তো, তুমি হলে কি থেমে যেতে? তবু প্রতিবার পানিতে পড়ে সে একটাই কথা বলে — “আর একবার। আর একবার।”
রাত নামল। ঝরনাতলার কালো পানিতে ভাঙা চাঁদ টলমল করে। ক্লান্ত কার্পের চোখে পানি — আর কি পারব? তখনই সে দেখল — ঝরনার ধাক্কায় চাঁদের ছায়া হাজারবার ভেঙে যাচ্ছে, আবার হাজারবার জোড়া লেগে যাচ্ছে। চাঁদ তো হাল ছাড়ে না! কার্প ফিসফিস করল — “আমিও ছাড়ব না।”
ভোরের প্রথম আলো পানিতে পড়তেই কার্প ডুব দিল অনেক গভীরে। তারপর লেজে ভর দিয়ে — শোঁ-ও-ও! সাদা পানির দেয়াল বেয়ে সে উঠছে… উঠছে… ঝরনা ঝাপটা মারে, ঠেলে নামায় — তবু ওঠে! গুড়ুম শব্দ পেছনে ফেলে, কুয়াশা ফুঁড়ে, ছোট্ট কার্প পার হয়ে গেল ড্রাগন-দুয়ার!
আর তখনই — ঝলমল! সোনার আলোয় ভরে গেল আকাশ। ছোট্ট কার্পের শরীর লম্বা হলো, আঁশ হলো সোনার — মেঘ পেঁচিয়ে উড়ল সে। ড্রাগন! ফিরে-আসা বন্ধুদের মাথায় সে ঝরাল মিষ্টি এক পশলা বৃষ্টি, আর ডেকে বলল — “একশোবার পড়ে গেলেও, আর একবার লাফ দিও, ভাই!”