এক গাঁয়ের ধারে ছিল টলটলে এক দিঘি, আর দিঘি থেকে নদী পর্যন্ত সরু একটা খাল। সেই দিঘিতে থাকত তিন বন্ধু — কই, ইলিশ আর পটকা। রোজ সকালে তিনজনে খেলত লুকোচুরি — ছলাৎ! ছলাৎ! কে সবার আগে শাপলার পাতা ছুঁতে পারে?
এক সন্ধ্যায় দিঘির পাড় দিয়ে ফিরছিল দুই জেলে। পানির দিকে ঝুঁকে একজন বলল — “ও ভাই, দেখো দেখো — কী মোটা মোটা মাছ!” আরেকজন মাথা নাড়ল — “কাল ভোরে জাল নিয়ে আসব। একটা মাছও ছাড়ব না।” শাপলার পাতার নিচে তিন বন্ধু চুপটি করে সব শুনল।
সেই রাতে কই বলল — “শুনলে তো! চলো, আজই খাল বেয়ে নদীতে চলে যাই — জাল আসার আগেই।” ইলিশ লেজ নাড়ল — “এত তাড়া কীসের ভাই? বিপদ এলে আমার বুদ্ধিই আমাকে বাঁচাবে।” আর পটকা? সে হেসে কুটিকুটি — “ধুর! জন্মের দিঘি ছেড়ে কোথায় যাব? যা হবার তা হবে!”
গভীর রাত। ঘুমন্ত দিঘির বুকে চাঁদের ছায়া টলমল করে। কই একা একা খালের মুখে এল। পেছন ফিরে একবার তাকাল — এই দিঘিতেই তার জন্ম, এই তার খেলার বাড়ি। বুকটা ভারী হয়ে এল। তবু সে ধীরে… ধীরে… সাঁতরে চলল নদীর দিকে।
ভোর হতেই — ঝপাং! দিঘির বুকে জাল পড়ল। পানি তোলপাড়, কাদা ঘোলা! “পটকা, পালাও!” বলে ছুট দিল ইলিশ। পটকা ভয়ে গাল ফুলিয়ে গোল হয়ে গেল — কিন্তু জাল যে চারদিকে! দড়ির ফাঁস এগিয়ে আসে… এগিয়ে আসে… দুজনেই আটকা পড়ল। এখন কী হবে?
জেলে জাল টেনে তুলতেই ইলিশ একদম নিথর হয়ে গেল — নড়ে না, চোখও ফেরে না, যেন কাঠ! জেলে নাক কুঁচকাল — “এহ্! এটা তো মরা মাছ, পচা!” — বলে ছুঁড়ে ফেলল ঘাসের ওপর, পানির একদম ধারে। এক… দুই… তিন! ফাল দিয়ে ইলিশ — ছলাৎ! সোজা দিঘির বুকে!
কিন্তু পটকা? জালের ভেতর সে ফুলেই রইল — ভাবল, কিছু একটা এমনি এমনিই হয়ে যাবে। কিছুই হলো না। জেলের ঝুড়িতে উঠল পটকা, ঝুড়ি উঠল কাঁধে। ছোট্ট দুই চোখে সে শেষবার দেখে নিল তার প্রিয় দিঘি। পটকা আর কোনোদিন ফিরে এল না।
বর্ষা নামতেই ইলিশও খাল বেয়ে নদীতে চলে এল — দিঘিতে আর মন টেকে না। সেখানে কইয়ের সঙ্গে দেখা! দুই বন্ধুর খেলা আবার জমল, তবু সন্ধ্যা হলেই দুজনে চুপ হয়ে যায় — তিনজনের খেলা যে আজ দুজনের। কই আস্তে করে বলে — “বিপদ আসার আগে যে ভাবে, সে-ই বাঁচে, ভাই।”