সাগরপাড়ে ভোর হলো। ছলাৎ ছল, ছলাৎ ছল — ঢেউ এসে ভেজা বালিতে ঝিনুক রেখে যায়। দূরে একটা জেলে নৌকা, পাড়ে নারকেল গাছের সারি। বালির গর্ত থেকে বেরোল মা-কাঁকড়া, পেছনে তার ছোট্ট ছানা — চিমটি।
চিমটি ছুটল ঝিনুক কুড়াতে। টুক টুক টুক — কাত হয়ে, আড়াআড়ি, ভেজা বালিতে খচমচ! সামনে যাবে কী — শরীর চলে পাশে! মা চুপ করে দেখছিল। দেখতে দেখতে তার চোখের ডাঁটি দুটো টানটান হয়ে উঠল।
মা এগিয়ে এসে বলল — “ছি ছি চিমটি! এ কেমন হাঁটা? সোজা হয়ে সামনে হাঁটো তো! সবাই দেখলে কী বলবে?” চিমটি থমকে দাঁড়াল। মাথার ওপর কড়া রোদ, ভেজা বালি চিকচিক করছে। সে মিনমিন করে বলল — “আমি তো সোজাই হাঁটছি, মা!”
চিমটি একটু ভেবে মায়ের কাছে এলো। “আচ্ছা মা, তুমি একবার হেঁটে দেখাও না! তুমি যেমন করে হাঁটবে, আমি ঠিক তেমন করে হাঁটব। সত্যি বলছি!” আকাশে একটা মেঘ এসে রোদ ঢেকে দিল। সাগরপাড় যেন নিশ্বাস চেপে অপেক্ষায় রইল।
মা বুক ফুলিয়ে বলল — “দেখো চিমটি, এই তো সোজা—” বলতে না বলতেই শরীর গেল পাশে! আবার চেষ্টা করল — টুক টুক, আবার পাশে! আরও জোরে, দাঁড়া উঁচিয়ে, আবার — এবারও আড়াআড়ি! লম্বা ছায়াটাও কাত হয়ে তার সঙ্গে সঙ্গে ছোটে। বলো তো, কাঁকড়া কি কখনো সোজা হাঁটতে পারে?
মা থেমে গেল। আকাশ তখন সাঁঝরঙা, ঢেউয়ের শব্দও নরম হয়ে এসেছে। সে নিজের পায়ের দিকে তাকাল — একটা-একটা করে, সবক’টাই পাশে বাঁকানো। দাঁড়া দুটো আস্তে নেমে এলো। চিমটি চুপটি করে এসে মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়াল।
মা হেসে ফেলল। “ধুর, বোকা আমি! যা নিজে পারি না, তা তোমায় শেখাতে গেছি। এখন থেকে আগে নিজে করে দেখাব, কেমন?” চিমটি খুশিতে দাঁড়া নাচাল। চাঁদের আলোয় ভেজা বালিতে দুটো আঁকাবাঁকা দাগ রেখে মা-ছানা পাশাপাশি চলল — টুক টুক, টুক টুক।