ঘন বনের ভেতর সরু এক পথ। ভোরের আলো পাতার ফাঁক গলে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ছে মাটিতে। কাঁধে পুরোনো লোহার কুড়াল, গলায় গামছা — গুনগুন গান গাইতে গাইতে চলেছে এক কাঠুরে। ঘরে তার পয়সা নেই বললেই চলে, তবু মুখে হাসি। এই কুড়ালটাই তার সব — কাঠ কাটে, কাঠ বেচে, তবেই চুলায় ভাত চড়ে।
খালের ধারে হেলে-পড়া এক মরা গাছ। কাঠুরে কোমরে গামছা বেঁধে লেগে গেল — ঠক্! ঠক্! ঠক্! হঠাৎ হাত ফসকে গেল। কুড়ালটা শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে — ছলাৎ! — ডুবে গেল গভীর কালো পানিতে। কাঠুরে ছুটে গিয়ে ঝুঁকে দেখল — শুধু ঢেউ আর ঢেউ। কুড়াল আর নেই।
কাঠুরে ধপ করে পাড়ে বসে পড়ল। বনটা কেমন চুপ হয়ে গেছে। শুধু টুপ… টুপ… পাতা থেকে পানির ফোঁটা পড়ে। নতুন কুড়াল কেনার পয়সা তার নেই। বুকের ভেতরটা খালি খালি লাগে। দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে সে ফিসফিস করল — “কাল থেকে কী করে চলবে আমার?”
হঠাৎ খালের পানি ভুরভুর করে ফুলে উঠল। চারদিক ভরে গেল নীলচে আলোয়! পানি ফুঁড়ে উঠে এল এক জলপরী — চুলে শাপলা ফুল, হাতে ঝকঝকে সোনার কুড়াল। মিষ্টি গলায় সে জিজ্ঞেস করল — “এই সোনার কুড়ালটা কি তোমার, বাছা?” আচ্ছা, তুমি হলে কী বলতে, বলো তো?
সোনার ঝিলিকে কাঠুরের চোখ ধাঁধিয়ে যায়। আঙুলগুলো নিশপিশ করে ওঠে… তবু সে ঢোঁক গিলে মাথা নাড়ল — “না গো। আমারটা লোহার, হাতলে ফাটল ধরা।” রুপার কুড়াল দেখেও বলল — “না গো, না।” জলপরী হেসে তিনটে কুড়ালই তার হাতে তুলে দিল — “সত্যি কথার এই পুরস্কার, বাছা।”
কথাটা কানে গেল পাশের বাড়ির লোভী কাঠুরের। সে দৌড়ে এসে ইচ্ছে করে নিজের কুড়ালটা ছুড়ে দিল খালে — ঝপাং! — তারপর মিছিমিছি কাঁদতে লাগল — “ও গো, আমার কুড়াল গেল গো!” জলপরী সোনার কুড়াল নিয়ে উঠে এল — “এটা কি তোমার?” লোভী লাফিয়ে উঠল — “হ্যাঁ হ্যাঁ, ওটাই আমার!”
জলপরী একটুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল — “লোহার কুড়ালের মালিক সোনার কুড়াল চিনল কী করে?” বলেই — ফুস! আলো নিভে গেল। পানি আবার কালো, আবার চুপচাপ। লোভী দাঁড়িয়ে রইল খালি হাতে — সোনা তো দূরের কথা, নিজের কুড়ালটাও আর ফিরল না।
সন্ধ্যা নামল বনে। জোনাকিরা জ্বলে টিপটিপ। লোভী কাঠুরে খালপাড়ে মাথা নিচু করে বসে আছে। সৎ কাঠুরে এসে তার কাঁধে হাত রাখল — “চলো ভাই, কাল থেকে দুজনে মিলে কাঠ কাটব। আমার তো এখন তিন-তিনটে কুড়াল!” লোভী চোখ মুছে বলল — “আর আমার একটাও নেই… সত্যিই ভাই, সততার দাম সোনার চেয়েও বেশি।”