গাঁয়ের ধারে ছোট্ট এক টিলা, তার নিচে ঘুমঘুম গ্রাম। সেই টিলায় রোজ ভেড়া চরায় এক রাখাল ছেলে। ভেড়ারা কুটকুট করে ঘাস খায়, প্রজাপতি ওড়ে, আর রাখাল বাঁশি ফেলে রেখে হাই তুলতে তুলতে বলে — “ধুর! রোজ একই টিলা, একই ঘাস। মজার কিছুই হয় না!”
হঠাৎ রাখালের মাথায় খেলে গেল এক দুষ্টু বুদ্ধি। সে দুই হাত মুখের কাছে নিয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচাল — “নেকড়ে! নেকড়ে এসেছে! বাঁচাও, বাঁচাও!” আর যায় কোথায়! গাঁয়ের মানুষ কাজ ফেলে, লাঠি হাতে দুদ্দাড় করে ছুটে এল টিলার উপর — “কই? কোথায় নেকড়ে?”
রাখাল হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল — “হি হি হি! নেকড়ে-টেকড়ে কিছু নেই! তোমরা সবাই বোকা বনেছ!” এক বুড়ো চাচা ঘাম মুছে বললেন — “ছি বাছা, মিথ্যা বলতে নেই।” রাখাল শুনল না। পরদিন আবার — “নেকড়ে!” তার পরদিন আবার। প্রতিবার মানুষ ছোটে, আর রাখাল হাসে। আচ্ছা, বলো তো — এরপর কী হবে?
তারপর এক সন্ধ্যায় ঝোপের ভেতর জ্বলে উঠল দুটো হলুদ চোখ। সত্যিকারের নেকড়ে! ভেড়ারা ব্যা-ব্যা করে ছোটাছুটি লাগাল। রাখালের বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস, হাত-পা ঠান্ডা। সে গলা ফাটিয়ে ডাকল — “নেকড়ে! এবার সত্যি সত্যি নেকড়ে! ও চাচা, বাঁচাও!”
গাঁয়ের মানুষ ডাক শুনল, কিন্তু কেউ নড়ল না। “হুহ্! আবার সেই মিথ্যা কান্না!” — বলে যে যার কাজে ফিরে গেল। রাখাল ডাকল… আবার ডাকল… গলা ভেঙে গেল, তবু কেউ এল না। আর নেকড়ে? পালের সবচেয়ে বড় দুটো ভেড়া তাড়িয়ে নিয়ে চলে গেল অন্ধকার বনে।
রাত নামল টিলার উপর। বাকি ভেড়াগুলো জড়সড় হয়ে রাখালের গা ঘেঁষে বসে রইল। রাখাল দুই হাঁটু জড়িয়ে ধরে চুপ করে বসে — চোখ বেয়ে টুপটাপ পানি পড়ে। আজ সে সত্যি বলেছিল, তবু কেউ বিশ্বাস করেনি। কেন করেনি — তা সে এখন বুঝে গেছে।
ভোরবেলা সেই বুড়ো চাচা টিলায় উঠে এলেন। রাখালের কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় বললেন — “বুঝলি বাছা? যে মিথ্যা বলে, তার সত্যি কথাও কেউ বিশ্বাস করে না।” রাখাল চোখ মুছে মাথা নাড়ল। সেদিনের পর সে আর কোনোদিন মিথ্যা বলেনি। শুধু হারানো ভেড়া দুটো আর কোনোদিন ফেরেনি।