সন্ধে নামছে গ্রামের কোণে। খেঁকু নামের ছোট্ট এক শিয়াল এঁটোকাঁটার গন্ধে উঠোনের ধারে ঘুরঘুর করছিল। ভেতর থেকে হঠাৎ — “হুশ! হুশ! যা এখান থেকে!” — সঙ্গে ঝাঁটার বাড়ি। কান দুটো নুইয়ে খেঁকু সরে গেল ঝোপের আড়ালে। “ইস, কেউ আমাকে পাত্তাই দেয় না। বড় কেউ যদি হতে পারতাম!”
হঠাৎ — “ঘেউ ঘেউ ঘেউ!” তেড়ে এলো গাঁয়ের কুকুরের পাল। খেঁকুর বুক ধড়াস ধড়াস! প্রাণপণে ছুট — এ-গলি, ও-গলি, দুড়দাড় দুড়দাড়। পেছনে দাঁত-খিঁচানো কুকুর, সামনে ঘন অন্ধকার। হাঁপাতে হাঁপাতে খেঁকু ঢুকে পড়ল এক রংমিস্ত্রির উঠোনে।
উঠোনের মাঝখানে বড় এক গামলাভরা নীল রং। আঁধারে ঠাহর না পেয়ে — ঝপাস! — সোজা তার ভেতরে। খানিক পরে টলতে টলতে উঠে এলো খেঁকু — মাথা থেকে লেজ, পুরো নীল! গা বেয়ে টপ্ টপ্ করে রং ঝরছে। ছোট্ট ডোবার আয়নায় নিজেকে দেখে সে থ — “ওমা! এ কি আমি, নাকি অন্য কেউ?”
ভোরবেলা নীল খেঁকু বুক ফুলিয়ে ঢুকল বনে। এমন আজব নীল জানোয়ার তো কেউ কোনোদিন দেখেনি! বাঘ, হাতি, চিতল হরিণ — সবাই ভয়ে জড়সড়। বাঘ মাথা নুইয়ে বলল — “আপনি কে, মহারাজ?” বুক আরও ফুলিয়ে খেঁকু বলল — “আমি সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারের রাজপ্রাণী। আজ থেকে আমিই এই বনের রাজা!”
বটগাছের নিচে পাথরের সিংহাসনে বসল রাজা খেঁকু। চিতল হরিণ কলাপাতায় এনে দেয় গরম ভাপা পিঠা, হাতি পাখা নাড়ে — বাহ্, বেশ আরাম! এমন সময় ঝোপ থেকে উঁকি দিল তারই এক শিয়াল-ভাই — “ভাই, খেঁকু না তুই?” চোখ নামিয়ে খেঁকু বাঘকে বলল — “ওদের সরিয়ে দাও।” বুকের ভেতরটা তবু কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে।
রাত গভীর। বনের ওপর থালার মতো চাঁদ উঠেছে। দূরে কোথাও ডেকে উঠল শিয়ালের পাল — “হুক্কা-হুয়া! হুক্কা-হুয়া!” ঘুম-জড়ানো খেঁকুর বুকটা কেমন করে উঠল। নিজের অজান্তেই গলা চড়িয়ে সে-ও ডেকে উঠল — “হুক্কা-হুয়াআআ!” চারদিক নিস্তব্ধ। বাঘ-হাতি হাঁ করে তাকিয়ে রইল — রাজা তবে... একটা শিয়াল!
হাসির রোল উঠল বনে — “রাজা নাকি! এ তো নীল রং-মাখা শিয়াল!” লজ্জায় খেঁকু ছুট দিল খালের ধারে। ছলাৎ ছলাৎ — পানিতে ধুয়ে গেল সব নীল। নিজের রূপে ফিরে এলো নিজের দলে। বুড়ো শিয়াল হেসে বলল — “ফিরেছিস, খেঁকু!” খেঁকু বলল — “এই তো আমি।” মনে রেখো, বন্ধু — সাজ যতই হোক, নিজে যা তাই-ই আসল।