পাহাড়ের কোলে থইথই বড় এক দিঘি। আজ সেখানে পাখিদের মেলা — ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসছে বক, টিয়া, ময়না, দোয়েল। ডানায় ডানায় ফরফর, ফরফর! হাঁসরাজা গলা তুলে ডাকলেন — “শোনো সবাই! আজ আমার মেয়ে নিজের বর বেছে নেবে।”
হাঁসকন্যা ধীর পায়ে চলল পাখিদের সারি ধরে — এক পা… আরেক পা… বক গলা টানটান করে দাঁড়াল, টিয়া পালক ফুলিয়ে বলল — “আমাকে দেখো!” ময়না গান জুড়ে দিল — “আমাকে! আমাকে!” হাঁসকন্যা মুচকি হেসে শুধু এগিয়ে যায়।
হঠাৎ হাঁসকন্যা থমকে দাঁড়াল। সামনে ময়ূর — গলায় নীল-সবুজ ঝিলিক, পেছনে পেখমের লম্বা ঢল। — “বাবা, ওই যে ময়ূর! ওর মতো সুন্দর কেউ নেই!” চারদিকে রব উঠল — “ময়ূর! ময়ূর!” গর্বে ময়ূরের বুক ফুলে উঠল।
আনন্দে ময়ূরের মাথা ঘুরে গেল! ঝপ করে খুলে দিল শত চোখের পেখম — “দেখো, আমি কেমন নাচি!” নাচল তো নাচল — ঘুরে ঘুরে, দুলে দুলে, আর থামেই না। এত খুশিতে কি মাথা ঠিক থাকে, বলো? পাখিরা চুপ। হাঁসরাজার ভুরু কুঁচকে গেল।
নাচ থামতেই হাঁসরাজা ধীরে বললেন — “ময়ূর ভায়া, রূপ তোমার আছে, কিন্তু লাজ কোথায়? নিজের ঢাক নিজে পেটালে!” তারপর মেয়ের ডানা ছুঁয়ে বললেন — “মা, ওই শান্ত ছোট্ট হাঁসই তোমার বর।” ময়ূরের পেখম আস্তে… আস্তে… নুয়ে পড়ল।
সন্ধ্যা নামল। দিঘির ধারে একা ময়ূর — পেখম গোটানো, চুপচাপ। স্থির পানিতে নিজের ছায়া কাঁপছে টলটল। কী সুন্দর পাখিটা! তবু বুকের ভেতর টনটন করে। কানে ঘুরে ঘুরে বাজে শুধু নিজের গলা — “দেখো, আমি কেমন নাচি!”
ভোরে টিপটিপ বৃষ্টি নামল। দোয়েল এসে পাশে বসল — “মন খারাপ, ভাই? তোমার পেখম কিন্তু আজও সবচেয়ে সুন্দর।” ময়ূর মৃদু হাসল — “রে ভাই, বড়াই করলে জেতা জিনিসও হারায়।” তারপর বৃষ্টির ছন্দে সে নাচল — এবার শুধু নিজের আনন্দে।