সন্ধ্যা নামছে বনে। সব পাখি যখন বাসায় ফিরে চোখ বুজছে, তখন বুড়ো বটগাছের কোটরে চোখ মেলল পেঁচি। সারাদিন সে ঘুমায়, সারারাত জেগে থাকে। তাই ছোট পাখিরা ফিসফিস করত — “এই বুড়ি কী অদ্ভুত! দিনে ঘুম, রাতে জাগা!”
মাঝরাত। জোছনায় চারদিক চুপচাপ। হঠাৎ পেঁচির বড় বড় চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল — দূরে মাঠের ধারে কে যেন চকচকে ধান ছড়িয়ে দিচ্ছে, আর তার ওপরে সরসর করে টাঙিয়ে দিচ্ছে পাতলা এক জাল! পেঁচি মনে মনে বলল, “ওটা ফাঁদ। কাল না জেনে কেউ ওখানে গেলেই বিপদ।”
ভোর হতেই পেঁচি ছোট পাখিদের ডেকে বলল — “শোনো, ওই মাঠের খোলা ধান খেতে যেয়ো না। ওখানে জাল পাতা আছে।” শুনে টুকটুকি বুলবুলি খিলখিল করে হাসল — “ফ্রিতে এত্ত ধান! আর তুমি বলছ যেতে না? রাতজাগা বুড়ি, তোমার সব কিছুতেই ভয়!” পাশের সবাই হেসে উঠল।
দুপুরবেলা রোদে ঝিকমিক করছে সেই ধান। টুকটুকির আর তর সইল না। বন্ধু চড়ুই বলল, “যাস না রে, পেঁচি বুড়ি বারণ করেছে!” কিন্তু টুকটুকি ডানা ঝাপটে ঝপ করে নেমে গেল মাঠে — “এত্ত মজার ধান কেউ ছাড়ে নাকি!”
ঠকাস! ধানে ঠোঁট ছোঁয়াতেই উপর থেকে জাল পড়ল টুকটুকির গায়ে। যত ছটফট করে, তত জড়িয়ে যায়! “বাঁচাও! আমাকে বাঁচাও!” — কেঁদে উঠল টুকটুকি। উপরে চক্কর দিতে দিতে বাকি পাখিরা ভয়ে কাঁপছে। এখন উপায়?
তখনই ডানা মেলে নেমে এল পেঁচি — শান্ত, স্থির। “ভয় পেয়ো না! চেঁচিয়ো না!” তার তীক্ষ্ণ চোখ জালের দুর্বল গিঁটটা ঠিক খুঁজে নিল। “সবাই মিলে ওই গিঁটে ঠোকর দাও — একসাথে! আরেকবার!” টুক… টুক… টুক… খুলে গেল গিঁট, মুক্ত হলো টুকটুকি!
আবার সন্ধ্যা। টুকটুকি লজ্জা পেয়ে পেঁচির পাশে এসে বসল — “আমাকে মাফ করো, পেঁচি নানি। তুমি ঠিকই দেখেছিলে।” পেঁচি মৃদু হেসে বলল, “চোখ-কান খোলা রাখো, ছোট্টরা।” সেদিন থেকে রোজ সন্ধ্যায় সবাই এসে বসে পেঁচির কথা শুনতে। মনে রেখো — চুপ করে যে দেখে আর শোনে, সে-ই বেশি জানে।