শীতের ভোর। নদীর ধারে মেলার মাঠে এল বিশাল এক উট। পিঠে বাতাসার বস্তা, মুড়কির হাঁড়ি — কত ভার! মেলার সবাই ব্যস্ত — কেউ ফিরেও তাকাল না। মাঠের এক কোণে উটটা চুপচাপ খড় চিবোতে লাগল। একা। একদম একা।
হঠাৎ টুপ করে তার কুঁজের ওপর নামল ছোট্ট এক দোয়েল পাখি। — “ওমা! এই পাহাড়টা নড়ে কেন গো?” উট হেসে ফেলল — “আমি পাহাড় নই রে, আমি উট!” দোয়েল শিস দিয়ে উঠল — টিউ-টিউ-টিরিরি! এমন মিঠা গান উট জীবনে শোনেনি।
সেদিন থেকে দুজন সারাক্ষণ একসঙ্গে। দোয়েল কুঁজে বসে গান গায়, উট বালির পথে হাঁটে — থপ থপ থপ। চলল তো চলল, রোদ মাথায় নিয়ে চলল। দোয়েল ডানা মেলে উটের চোখে ছায়া দেয়, উট নুইয়ে দেয় বাবলার ডাল। — “তুই পাশে থাকলে পথটাও ছোট লাগে রে!”
মেলায় ফিরে ক্লান্ত উট ঘুমিয়ে পড়ল। তখনই এল এক ফেরিওয়ালা শিয়াল — খাঁচা-ভরা গাড়ি নিয়ে। দোয়েলের গান শুনে তার চোখ চকচক করে উঠল — “এই গান বেচতে পারলে তো কেল্লাফতে!” মুড়কির দানা ছড়িয়ে ফাঁদ পাতল সে… খুট! — “উট ভাই! উট ভাই!” কিন্তু উট তখন গভীর ঘুমে।
সকালে ঘুম ভেঙে উট দেখল — কুঁজ খালি। দোয়েল নেই, কোত্থাও নেই। সেদিন উট খড় ছুঁল না। পরদিনও না। বস্তা তুলতে ডাকলে মাথা নাড়ল, শুধু আকাশের পাখিদের দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতরটা খালি… আরও খালি… মেলার সবাই ফিসফিস করল — “উটটার বুঝি বড় অসুখ!”
রাত নামল। এল বুড়ি পেঁচা — মেলার সবচেয়ে জ্ঞানী পাখি। পরখ করে দেখল — জ্বর নেই, ক্ষতও নেই। নরম গলায় জিজ্ঞেস করল — “বলো তো বাছা, তোমার কী হারিয়েছে?” লম্বা পাপড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা পানি — “আমার দোয়েল।” পেঁচা মাথা নাড়ল — “এ অসুখ ওষুধে সারে না। সারে বন্ধুতে।”
ভোরে খোঁজ মিলল — শিয়ালের দোকানে ঝুলছে খাঁচা, ভেতরে চুপটি করে বসে দোয়েল। শিয়াল যতই বলে — “গা! গা না রে!” — দোয়েল একটা শিসও দেয় না। পেঁচা বলল — “দেখলে ভায়া? খাঁচায় ভরলেই গান মরে যায়। গান কেনা যায় না — ভালোবাসলে এমনি আসে।” শিয়ালের কান নেমে গেল। সে নিজেই খুলে দিল খাঁচার দরজা।
টিউ-টিউ-টিরিরি! এক নিমেষে দোয়েল উড়ে এসে বসল চেনা কুঁজে — গানে ভরে গেল গোটা মেলা। উটের চোখ আবার ঝিকমিক করে উঠল। আর সেই শিয়াল? খালি খাঁচাটা দোকানের কোণে রেখে দিল — মনে রাখবে বলে। দেহে অমিল যতই থাক, মন মিললেই বন্ধু। তোমারও কি এমন কোনো বন্ধু আছে?