ঝলমলে গরমের দুপুর। মাঠভরা সোনালি ধান বাতাসে দোল খায়। এক সারি পিঁপড়া — পিলু আর তার বন্ধুরা — পিঠে ধানের দানা নিয়ে চলেছে গর্তের দিকে, এক পা… আরেক পা… এক পা… আরেক পা। আর ঘাসের ডগায় বসে ঘাসফড়িং ঝুমঝুম বাজায় পাতার বেহালা — টুংটাং, টুংটাং! “বাহ্, কী মজার দিন!”
ঘাম ঝরিয়ে দানা টানছিল পিলু। ঝুমঝুম হেসে ডাকল — “আরে পিলু ভাই! এই রোদে খেটে মরছ কেন? এসো, আমার সঙ্গে গান গাও!” পিলু দানা নামিয়ে বলল — “শীত আসছে, ঝুমঝুম। তখন মাঠে দানা মিলবে না। এখনই জমিয়ে রাখি।” ঝুমঝুম কাঁধ ঝাঁকাল — “দূর! শীত তো ঢের দেরি।”
আস্তে আস্তে হেমন্ত এল। গাছের পাতা হলুদ, তারপর লাল — ঝরে পড়ে মড়মড়। পিলুরা শেষ দানাগুলো তুলে গর্তের মুখ বন্ধ করছিল। পিলু আরেকবার ডাকল — “ঝুমঝুম, ঠান্ডা ঘনিয়ে এল, কিছু খাবার জমিয়ে নাও!” ঝুমঝুম গড়িয়ে হাসল — “তোমরা খাটো, আমি গাই!” বলে ফুড়ুৎ লাফিয়ে গেল।
তারপর এল কনকনে শীত। এক রাতেই চারদিক বরফে সাদা — মাঠ ফাঁকা, একটা দানাও নেই। ঝুমঝুম কাঁপে থরথর, ডানা জড়িয়ে গুটিসুটি বসে থাকে। পেটের ভেতর ক্ষিদেটা কুটকুট করে। মনে মনে বলল — “ইস, পিলুর কথাটা যদি শুনতাম!”
রাত গভীর হলো। বরফ-ঢাকা মাঠে শুকনো এক ডালের নিচে ঝুমঝুম একা — চুপচাপ, নিথর। মাথার ওপর ঠান্ডা চাঁদ, কোথাও কোনো শব্দ নেই। খিদে আর শীতে সে জড়সড়। তোমার কি ঝুমঝুমের জন্য মন খারাপ লাগছে? এই সময় — ওই তো, দূরে একটুখানি আলো টিমটিম করে জ্বলছে।
আলোটা তো পিলুদের গর্তের মুখ! বরফ ভেঙে ভেঙে ঝুমঝুম এসে দাঁড়াল দরজায়, দুই পা জোড় করে — “পিলু ভাই, ভেতরে একটু ঠাঁই দেবে? সারাটা গরমকাল আমি শুধু গান গেয়েছি…” পিলু এক পলক তাকাল, তারপর নরম গলায় বলল — “ভেতরে এসো, ভাই। এই ঠান্ডায় কাউকে বাইরে রাখি না।”
গর্তের ভেতরে আরামের উষ্ণতা। চারদিকে থরে থরে সাজানো ধান আর খুদ। ঝুমঝুমকে ওরা গরম খাবার দিল, পাশে বসাল। খেতে খেতে ঝুমঝুম বলল — “শীত গেলে আমিও তোমাদের সঙ্গে খাটব, কথা দিলাম।” পিলু হেসে বলল — “আনন্দের সময় আনন্দ, কাজের সময় কাজ — দুটোই থাকুক।” বাইরে বরফ পড়ে, ভেতরে সবাই মিলে হাসে।