সকালবেলা ফুলবাগানে ব্যস্ত পিঁপড়া পিকু। কাঁধে একটা মস্ত রুটির টুকরো, ছয় পায়ে দুড়দাড় ছোটে সে — এই গাঁদাফুলের ডাল, ওই জবার পাতা, সারা বাগান চষে বেড়ায়। বুক ফুলিয়ে পিকু বলে — “আমার মতো চটপটে আর কে আছে! সকাল ফুরানোর আগেই গোটা বাগান ঘুরে আসি!”
পাতার ওপর ধীরে ধীরে চলছিল এক ছোট্ট শুঁয়োপোকা — এক ভাঁজ… আরেক ভাঁজ। পিকু হেসে গড়িয়ে পড়ে — “ওরে বাবা, এত্ত ধীরে! আমি যেখানে খুশি ছুটে যাই, তুমি একটা পাতাও পেরোতে পারো না!” শুঁয়োপোকা মুখ তুলে নরম গলায় বলল — “তাড়া কীসের, ভাই? সবার নিজের সময় আছে।”
কদিন পরে। ধীরে ধীরে শুঁয়োপোকা বেয়ে উঠল বাঁশের এক সরু কঞ্চিতে। তারপর নিজেকে জড়িয়ে-মুড়িয়ে বানিয়ে ফেলল ছোট্ট এক খোলস — চুপচাপ, নিথর, ঝুলে রইল ডালের গায়ে। ঘুম-ঘুম গলায় সে শুধু বলল — “একটু জিরিয়ে নিই… সময় হলেই তো দেখা হবে।”
বিকেলে পিকু ঘুরতে ঘুরতে এসে দেখে সেই খোলস। খিলখিল হেসে ওঠে — “হায় হায়, আগে ছিলে ধীর, এখন তো একেবারে ঝুলে আটকা! বেচারা!” ভেতর থেকে মৃদু গলা ভেসে এল — “সময় হলে দেখা হবে, ভাই।” পিকুর বুকটা এক মুহূর্ত খচখচ করে উঠল — তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে সে আবার ছুটল।
রাত নামল বাগানে। ফুল ঘুমিয়ে পড়েছে, ঝিঁঝিঁরাও থেমে গেছে। থালার মতো চাঁদের নিচে ছোট্ট খোলসটা একা ঝুলে রইল — নিঃশব্দ, স্থির। এদিক-ওদিক জোনাকি জ্বলে-নেভে। ভেতরে ভেতরে চলছিল অপেক্ষা… আরও একটু অপেক্ষা… জানো, ভেতরে কী হচ্ছিল?
ভোরের প্রথম আলো ফুটল। শিশিরে ভেজা খোলসটা আস্তে আস্তে ফাটতে লাগল — বেরিয়ে এল ভেজা, কুঁকড়ানো দুটো ডানা নিয়ে ছোট্ট এক প্রাণী। ধীরে ধীরে ডানা মেলছে, রোদে শুকোচ্ছে — লাল, কমলা, সোনালি! অবাক হয়ে ফিসফিস করে সে বলল — “এই ডানা… সত্যিই কি আমার?”
সোনালি আলোয় ডানা মেলে প্রজাপতি ভেসে উঠল — ফুরফুর, ফুরফুর! নিচে পিকু হাঁ করে তাকিয়ে রইল, ছয় পা যেন মাটিতে আটকে গেছে। মাথার ওপরে চক্কর দিয়ে প্রজাপতি হেসে বলল — “বিদায়, পিকু ভাই! তুমি সারা বাগান দৌড়াও, আজ আকাশটা আমার পথ। বলেছিলাম না — সবার নিজের সময় আসে?”
গাঁদা-জবার ওপর দিয়ে ভাসতে ভাসতে প্রজাপতি মিলিয়ে গেল দূর আকাশে। পিকু আর বুক ফোলায় না — চুপটি করে চেয়ে থাকে, মনটা কেমন নরম হয়ে ওঠে। সেদিন থেকে ছোট কাউকে দেখলেই পিকুর মনে পড়ে — সময় হলে সবাই বড় হয়, তাই কাউকে ছোট ভেবো না।