শীত আসছে। মা শূকর তিন ছানাকে ডেকে বললেন — “বাছারা, এবার নিজের ঘর নিজে বাঁধো। মনে রেখো — শক্ত করে বেঁধো!” তিন ভাই গাঁটরি কাঁধে পথে নামল। বড়টা ভাবে খেলার কথা, মেজোটা ভাবে ঘুমের কথা। আর ছোটটা? সে ভাবে — ঘরটা কেমন করে শক্ত হবে।
বড় ভাই খড় জড়ো করে বেলা না গড়াতেই ঘর বানিয়ে ফেলল — খসখস, ব্যস! মেজো ভাই কঞ্চি বেঁধে বানাল কঞ্চির ঘর — ঠকঠক, শেষ! দুই ভাই নাচতে নাচতে ডাকল — “ও ছোট ভাই, খেলতে আয়!” ছোটটা কাদামাখা হাতে হাসল — “আগে ঘর, পরে খেলা।” আচ্ছা, তুমি হলে কোন ঘরটা বানাতে?
রোদে পুড়ে ছোট ভাই কাদা ছানে, ছাঁচে ফেলে ইট গড়ে। একটা ইট… দুটো ইট… একশো ইট! কপাল বেয়ে টুপটাপ ঘাম। বড় দুই ভাই হাসে — “বোকা রে! এত খাটে কেউ?” ছোটটা ইট গাঁথতে গাঁথতে বলে — “ঝড়ের দিন এলে বুঝবি, ভাই।” সাত দিনে দাঁড়াল ইটের ঘর — মজবুত দেয়াল, উঁচু চিমনি।
এক সন্ধ্যায় বন থেকে এল এক নেকড়ে — খিদেয় চোখ জ্বলজ্বল। খড়ের ঘরের দরজায় থাবা — “ছোট্ট ছানা, দরজা খোলো!” ভেতর থেকে কাঁপা গলা — “না, না, না! খুলব না!” নেকড়ে দাঁত বের করে হাসল — “তবে ফুঁ দেব, ফু-উ-উ দেব, ঘর উড়িয়ে দেব!” হুড়মুড়! খড় উড়ে গেল হাওয়ায়। বড় ভাই ছুট!
বড় ভাই হাঁপাতে হাঁপাতে ঢুকল মেজোর কঞ্চির ঘরে। কিন্তু নেকড়ে পিছু পিছু — “দরজা খোলো!” — “না, না, না!” — “তবে ফুঁ দেব, ফু-উ-উ দেব!” মড়মড়! কঞ্চির ঘরও ভেঙে পড়ল। দুই ভাই প্রাণপণে ছুটল ছোট ভাইয়ের ইটের ঘরের দিকে — পেছনে নেকড়ের গরম নিশ্বাস!
ইটের ঘরে হারিকেনের নরম আলো। তিন ভাই জড়াজড়ি করে বসে — বুক ধুকপুক। বাইরে নেকড়ে ফোঁস ফোঁস ফুঁ দেয় — একবার, দুবার, দশবার! কিন্তু ইটের দেয়াল নড়ে না, একটুও না। বড় ভাই ফিসফিস করল — “ভাঙবে না তো?” ছোটটা শান্ত গলায় বলল — “না ভাই। প্রতিটা ইট আমি নিজের হাতে গড়েছি।”
ভোরের দিকে নেকড়ে চুপিচুপি উঠল ছাদে — “হেহ্, চিমনি দিয়ে নামব!” কিন্তু ছোট ভাই আগেই চুলায় চড়িয়েছে বিরাট এক হাঁড়ি গরম পানি। নেকড়ে নামতেই লেজে ছ্যাঁকা — “আউউউ!” এক লাফে চিমনি ফুঁড়ে বেরিয়ে, লেজ থেকে ধোঁয়া উড়িয়ে সে ছুটল বনের দিকে। আর কোনোদিন ফেরেনি।
তারপর সারা শীত ধরে তিন ভাই মিলে গড়ল আরও দুটো ইটের ঘর। খড়ের ঘর আর কঞ্চির ঘর? হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে — আর ফেরেনি। ইট ছানতে ছানতে বড় দুই ভাই এখন নিজেরাই গান ধরে — “একটা ইট… দুটো ইট… শক্ত ঘর!” ছোটটা হাসে। ঘাম দিয়ে গড়া ঘর, ফুঁয়ে ভাঙে না।