এক ছিল ছোট্ট টুনটুনি, নাম তার টুনি। গেরস্ত বাড়ির পেছনের উঠানে, বেগুন গাছের কাঁটাভরা ডালে, পাতা সেলাই করে সে বেঁধেছে থলের মতো বাসা। বাসায় তিন ছানা পিটপিট করে তাকায় — উড়তে এখনো শেখেনি। টুনি ডানা মেলে ওদের ঢেকে বলল — “ভয় নেই সোনারা, মা আছি তো।”
সেই বাড়িতে ছিল মিনি বিড়াল — মস্ত থাবা, চকচকে চোখ। বেগুন গাছের নিচে এসে সে জিভে ঠোঁট চেটে বলল — “বাহ্! কচি কচি ছানা, আজ আমার দাওয়াত!” ছানারা ভয়ে থরথর কাঁপে, বাসাটাও কাঁপে খচমচ। টুনির বুকের ভেতর ধুকপুক, ধুকপুক।
টুনি কিন্তু ভয়ে উড়ে পালাল না। বুক ধুকপুক করছে, তবু ডালে নেমে মাথা নুইয়ে কুর্নিশ করে মিষ্টি সুরে বলল — “মহারানী! কী সুন্দর তোমার রূপ! তোমাকে দেখলেই আমার দিন ভালো যায়।” মিনি খুশিতে গোঁফে তা দিল, লেজ ফুলিয়ে বলল — “হুম, তা তো বটেই!” তারপর ছানাদের না ছুঁয়েই চলে গেল।
এরপর রোজ রোজ মিনি আসে, চোখ চকচক করে বলে — “আজ কিন্তু খাব!” আর রোজ রোজ টুনি মাথা নুইয়ে বলে — “মহারানী, তোমার মতো দয়ালু আর কে আছে?” খুশি হয়ে মিনি ফিরে যায়। এদিকে ধীরে ধীরে, ধীরে ধীরে, ছানাদের ডানায় বল আসে — বলো তো, কে বেশি চালাক?
সন্ধ্যা নামল। বেগুন পাতার ফাঁকে প্রথম তারা জ্বলে উঠল টিমটিম। টুনি চুপটি করে ছানাদের পাকা ডানায় ঠোঁট বুলাল — কাল ওরা উড়বে। ফিসফিস করে বলল — “আর একটা রাত, সোনারা।”
ভোর হতেই ফুড়ুৎ! ফুড়ুৎ! ফুড়ুৎ! — তিন ছানা উড়ে গিয়ে বসল উঁচু তালগাছে। মিনি এসে দেখে বাসা খালি — শুধু কটা পালক পড়ে আছে। তালগাছের মাথা থেকে টুনি হেসে ডাকল — “ও মহারানী! ওপরে তাকাও! ছানারা এখন হাওয়ার রাজা, নাগাল আর পাবে না!”
রাগে মিনির লেজ ফুলে ঢোল! ফোঁস করে সে লাফিয়ে উঠল বেগুন গাছে — কিন্তু ছানা কই? খালি কাঁটা আর কাঁটা! খোঁচা খেয়ে মিনি চেঁচাল — “ওরে বাবা! উহ্! আহ্!” — তারপর হুড়মুড় করে পড়ল নিচে, ধুপ!
সোনালি বিকেলে তালগাছের মাথায় টুনির পাশে তিন ছানা। নিচ দিয়ে মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরছে মিনি — সেই থেকে সে আর কোনোদিন টুনিদের ধারেকাছে আসেনি। ছোট ছানা জিজ্ঞেস করল — “মা, তুমি ভয় পাওনি?” টুনি হেসে বলল — “পেয়েছি তো! কিন্তু মনে রাখিস — গায়ের জোরে নয়, বুদ্ধির জোরে জেতে ছোটরাও।”