পাহাড়ের চূড়ায় এক বড় আমবাগান, আর সেখানে থাকে একদল বানর। তাদের রাজা বুড়ো বীর রোজ ডেকে বলে — “আগে ছোটরা খাক, তারপর আমরা।” কিন্তু ছোট্ট লাফু কারও কথা শোনে না — ডালে ডালে লাফ দিয়ে বলে, “আমার মতো লাফ কেউ পারে না! বুড়ো রাজার এত ভয় কেন?”
একদিন দুপুরে হঠাৎ — পোড়া গন্ধ! দূরের বন থেকে ধোঁয়া উঠছে, গাছে গাছে ছুটে আসছে লাল আগুন — দাউদাউ! পাখিরা হুড়মুড় করে উড়ে গেল, বানরেরা ভয়ে চিৎকার জুড়ল। বীর শান্ত গলায় ডাকল — “ভয় নয়! সবাই খাদের ধারে চলো — ছোটদের আগে নাও!”
খাদের ধারে এসে সবাই থমকে গেল। সামনে গভীর খাদ — এত চওড়া যে পার হওয়া অসম্ভব! ওপারে সবুজ বন ডাকছে, মাঝখানে শুধু শূন্য। পেছনে আগুন, সামনে খাদ। এমনকি সেরা লাফবাজ লাফুও তাকিয়ে কেঁপে উঠল — “এ… এত দূর তো আমিও পারব না।”
বীর চোখ বুলিয়ে নিল খাদটা। এক লম্বা বেতলতা কোমরে বেঁধে, ওপারের গাছ লক্ষ্য করে দিল প্রাণপণ লাফ — সাঁ! হাতে আঁকড়ে ধরল ওপারের ডাল, পা রইল এপারে আটকে। নিজের শরীরটাকেই টান টান করে বিছিয়ে দিল খাদের উপর — জ্যান্ত এক সাঁকো! “এসো, আমার পিঠে পা রেখে পার হও — ভয় নেই!”
এক এক করে বানরেরা উঠে পড়ল রাজার পিঠে। ধুপ… ধুপ… ধুপ… এক পা… আরেক পা… ছোট ছোট পায়ে ওরা ছুটল ওপারে। বীরের হাত টনটন করছে, পিঠ বেঁকে যাচ্ছে ভারে — তবু সে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে রইল। “ভয় পেয়ো না, আরও জোরে চলো!” হাঁপাতে হাঁপাতে বলল সে।
সবার শেষে রইল লাফু। রাজার পিঠে পা রাখতেই সে দেখল — বীরের হাত কাঁপছে, চোখ বন্ধ, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, তবু মুখে একটুও শব্দ নেই। এতক্ষণে লাফু বুঝল, গোটা দলটাকে বীর নিজের শরীরে বয়ে নিয়েছে। তার গলা ধরে এল। বীর আস্তে বলল — “যা বাবা, ভয় নেই — আমি আছি।”
ভোরের আলোয় সবাই ওপারের বনে — নিরাপদ! খাদের ওদিকে আগুন নিভে গেল, পার হতে পারল না। লাফু আর ছোটরা ক্লান্ত বীরকে ধরে নামাল, তার ফোলা হাতে কচি পাতা বেঁধে দিল। লাফু মাথা নিচু করে বলল — “রাজা, আজ বুঝলাম — যে সবাইকে নিজের পিঠে পার করে, সে-ই আসল বীর।” তুমিও কি এমন করে সবাইকে আগলে রাখবে?