সাল বনের ঝিলটা সকালবেলা আয়নার মতো শান্ত। চমক নামের ছোট্ট চিতল হরিণ পানি খেতে এসে নিজের ছায়া দেখল। মাথার ডালপালার মতো শিং দুটো দেখে তার বুকটা গর্বে ফুলে উঠল। বাঁশের আগায় বসে নীলু মাছরাঙা ডাকল — “এই যে চমক, সকাল হয়ে গেল!” চমক শিং নাড়তে নাড়তে আনমনে বলল — “দেখেছ নীলু, আমার শিং দুটো কী সুন্দর!”
নীলু মাথা কাত করে বলল — “শিং তো ছবির মতো, চমক। কিন্তু দৌড়ায় কে শুনি? ওই সরু ঠ্যাং দুটোই তো!” শুনে চমকের মুখটা গোমড়া হয়ে গেল। লজ্জায় সে চুপচাপ নলখাগড়ার ভেতর পা দুটো লুকিয়ে ফেলল — শুধু শিং দুটো রোদে ঝিকিমিকি করতে থাকল।
হঠাৎ বনের ভেতর পাখিরা হুড়মুড় করে উড়ে গেল। দূরে কোথাও ভেসে এল শিকারি কুকুরের ডাক — ঘেউ… ঘেউ…! চমক এক পা তুলে থমকে দাঁড়াল, তার কান দুটো পেছনে নুইয়ে পড়ল, দম বন্ধ। নীলু চেঁচিয়ে উঠল — “এখন ভাবার সময় নয়, চমক — দৌড়াও!” আচ্ছা বলো তো, চমক কি পারবে পালাতে?
এবার সেই সরু ঠ্যাং দুটোই যেন ডানা হয়ে গেল! চমক ছুটল — এক লাফ, আরেক লাফ, তারপর আরেক লাফ। সরু খালটা সাঁ করে এক লাফেই পার! নীলু মাথার উপরে উড়তে উড়তে পথ দেখাল — “বাঁয়ে যাও, চমক, বাঁয়ে!” হাঁপাতে হাঁপাতে চমক বলল — “যাচ্ছি—!”
কিন্তু বেতঝোপে ঢুকতেই — খটাস! গর্বের শিং দুটো বেত আর গেওয়ার ডালে আটকে গেল। চমকের চোখ বড় বড়, গলা টানটান, পা দুটো মাটি আঁচড়াচ্ছে। নীলু কানের কাছে চেঁচাল — “মাথা নিচু করো, চমক — এক মোচড় দাও!” প্রাণপণে মোচড় দিয়ে সে ছাড়া পেল, শিঙের একটা ডাল ঝোপেই রয়ে গেল।
সন্ধে নামল। চমক ফিরে এল সেই পানির ধারে। পা দুটো তখনো কাঁপছে, বুক ওঠানামা করছে, শিঙের একটা দিক ভাঙা। মাথা নিচু করে সে নিজের সরু পা দুটোর দিকে চেয়ে রইল। কিছু বলল না। নীলুও চুপ করে পাশে এসে বসল।
রাতে ঝিলের ধারে জোনাকিরা জ্বলে উঠল। চমক আবার এল পানির কাছে, এবার বুক টান করে সোজা দাঁড়াল — পানিতে এবার তার সরু পা দুটোই আগে ভেসে উঠল। সে হেসে বলল — “সাজ নয়, নীলু, কাজেই আসল পরিচয়।” নীলু ভাঙা শিঙে বসে দুষ্টুমি করে বলল — “তবে শিংটা থাক, আমার বসার ডাল লাগবে!” দুজনে হেসে উঠল।