বনের সবচেয়ে লম্বা ছিল মেঘলা জিরাফ। তার গলা এত লম্বা যে মাথাটা প্রায় মেঘ ছুঁয়ে ফেলত — উঁচু ডালের পাতায় ঠেকে সরসর শব্দ হতো! কিন্তু মেঘলার একটু লজ্জা লাগত — সবাই বেঁটে, খালি সে-ই কেন এত আলাদা? তাই গলাটা নিচু করে সে ছোট হয়ে থাকার চেষ্টা করত।
একদিন বনের রাজা রাজু সিংহ মেঘলাকে দেখে হো হো করে হেসে উঠল — “এ আবার কেমন গলা! মই নাকি? এই গলায় না যায় দৌড়ানো, না যায় গর্জন করা!” পাশের সবাই খিলখিল করে হাসল। মেঘলার গলাটা নুয়ে পড়ল, চোখে এক ফোঁটা পানি টলমল করল।
এল ভীষণ খরা। রোদ চড়ল… মাটি ফাটল… পুকুর শুকিয়ে কাঠ, খালের তলা চৌচির। সবাই তেষ্টায় ছটফট করতে লাগল। রাজু গর্জে উঠল — “পানি চাই! এক্ষুনি পানি চাই!” কিন্তু গর্জন করে কি আর পানি আসে?
তখন মেঘলা তার লম্বা গলাটা উঁচু করল — আরও উঁচু, বটগাছের চেয়েও উঁচু! দূরে, পাহাড়ের ওপারে কী যেন চিকচিক করছে — পানি! যে গলা নিয়ে সবাই হেসেছিল, সেই গলাই আজ সবার আগে পানি খুঁজে পেল। মেঘলা চেঁচিয়ে উঠল — “সবাই এসো! ওই দিকে পানি আছে!”
মেঘলা আগে আগে চলল, পিছনে সবাই সারি বেঁধে। ছোট্ট খরগোশছানা হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত — মেঘলা গলা নামিয়ে তাকে পিঠে তুলে নিল। একটু পরেই — ঝলমলে এক বড় পুকুর! সবাই ছলাৎ ছলাৎ পানি খেয়ে জুড়িয়ে গেল। কী যে আনন্দ!
সন্ধ্যা নামল। ভরা পুকুরের ধারে সবাই যখন বিশ্রাম নিচ্ছে, রাজু আস্তে আস্তে মেঘলার কাছে এল। মাথা নিচু, গলার স্বর নরম। “আমি তোমার গলা নিয়ে হেসেছিলাম, মেঘলা… অথচ সেই গলাই আজ আমাদের সবাইকে বাঁচাল। আমাকে মাফ করে দাও।”
মেঘলা মিষ্টি করে হাসল — “মাফ তো কবেই করে দিয়েছি, রাজু। চলো, এখন থেকে আমরা বন্ধু।” সেদিন থেকে বনের সবাই বুঝল — কেউ বেঁটে, কেউ লম্বা, কেউ জোরে দৌড়ায়, কেউ অনেক দূর দেখে। সবার আলাদা একটা গুণ আছে। আর যাকে নিয়ে আজ হাসো, কাল হয়তো সেই-ই তোমায় বাঁচায়।